চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যেও কর্ণফুলী নদী ঘিরে জমে উঠেছে চোরাই তেলের রমরমা বাণিজ্য। প্রতিদিন ৫০ হাজার লিটারের বেশি তেল চোরাই পথে বেচাকেনা হচ্ছে। রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানির ডিপো এবং চট্টগ্রাম বন্দরে আসা দেশি-বিদেশি জাহাজ থেকে এই অবৈধ বাণিজ্য করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। ‘তেল শুক্কুর’ নামের এক চিহ্নিত চোরাকারবারির নেতৃত্বে চলা এই চক্রকে রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ছত্রছায়া দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকার প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারালেও, প্রভাবশালী মহলের আশ্রয়ে চক্রটি ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যাচ্ছে।
জানা যায়, দেশে জ্বালানি তেল আমদানি ও বিক্রির নিয়ন্ত্রণ পুরোটাই সরকারিভাবে করা হয়। বিপিসি নিজেদের কোম্পানির মাধ্যমে তা বাজারজাত করে। প্রচলিত আইনে জ্বালানি তেল আমদানি বা বাজারজাতের সুযোগ ব্যক্তি পর্যায়ে নেই। কিন্তু চোরচক্র দিনের আলো কিংবা রাতের আঁধারে রাষ্ট্রায়ত্ত পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ বিভিন্ন কোম্পানির ডিপো এবং দেশি-বিদেশি জাহাজ থেকে কৌশলে তেল কিনে নিচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চট্টগ্রাম বন্দরে আমদানি-রপ্তানি পণ্য নিয়ে প্রতিদিন বহু দেশি-বিদেশি জাহাজ আসা-যাওয়া করে। এসব জাহাজ অনেক সময় প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জ্বালানি তেল নিয়ে আসে। অতিরিক্ত তেল স্থানীয় চোরচক্রের সদস্যদের কাছে কম দামে বিক্রি করে দেয়। চোরাই পথে এ তেল দেশে প্রবেশের কারণে সরকারকে শুল্ক দিতে হয় না। তাই অনেক কম দামে তা খোলাবাজারে বিক্রি করা হয়। নদী ঘিরে চোরাই তেলের এই বাণিজ্যে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে থাকে চিহ্নিত কিছু গোষ্ঠী। এই চক্রের মূল হোতা শুক্কুর বাহিনীর প্রধান ‘তেল শুক্কুর’। তিনি কর্ণফুলীর দক্ষিণ তীরের বাসিন্দা। তার লোকজন বিভিন্ন কোম্পানির অয়েল ট্যাংকারে বৈধভাবে নিয়োগ করা ঠিকাদারকে কাজ করতে দেয় না। এ বাহিনীতে আছে ১৭ দখলবাজ। তাদের প্রত্যেকের নামেই আছে তেল চোরাচালান, মারধর ও নির্যাতনের মামলা।
এদের মধ্যে রয়েছে-রফিক, নাছির, আলী, বেলাল, নুরুচ্ছফা, জাফর, জিয়া, জসিম, মহিউদ্দিন, তৈয়ব, হোসেন, হারুন, খোরশেদ, আনছার, আমির, কাদের ও ইউসুফ। স্থানীয়রা জানান, দুই দশক আগে শুক্কুর ছিলেন শ্রমিক। এখন তিনি শতকোটি টাকার মালিক। কর্ণফুলীর জুলধা ইউনিয়নে তার আছে বিশাল বাড়ি। তার বিরুদ্ধে তেল চোরাচালানের অভিযোগে দেড় ডজনের বেশি মামলা হয়েছে। পতেঙ্গা গুপ্তখাল ডিপোসহ বঙ্গোপসাগরের চোরাই তেলের একক নিয়ন্ত্রক এই তেল শুক্কুর। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্যের কারণে সব সময়ই ছিলেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। এখনো ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতার ছত্রছায়ায় কর্ণফুলীতে চোরাই তেলের সাম্রাজ্য ধরে রেখেছেন।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রতিদিন কর্ণফুলীতে প্রায় ৫০ হাজার লিটার চোরাই তেল বেচাকেনা হয়। এসব তেলের মূল বিক্রেতা বিদেশি জাহাজ, দেশি কার্গো ভেসেল, সরকারি বিভিন্ন সংস্থার জাহাজ, ব্যক্তিমালিকানাধীন ফিশিং ট্রলার ও নৌকা। তেল চোর চক্রের সদস্যরা জাহাজ থেকে প্রতি লিটার তেল ৫০ থেকে ৫৫ টাকায় কেনে। পরে সেই তেল পাইকারদের কাছে ৬০ থেকে ৭০ টাকা লিটার দরে বিক্রি করে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের দামামা বাজার পর চট্টগ্রামে তেলের চাহিদা বেড়েছে কয়েকগুণ। এর ফলে সম্প্রতি এই তেল চোরচক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। জাহাজ থেকে চোরাই তেল কেনার পর তা কর্ণফুলী নদীর কমপক্ষে ১৫ পয়েন্টে খালাস হয়।
এর মধ্যে ১৫ নম্বর মেরিন একাডেমি ঘাট, ১৪ নম্বর কালুমাঝির ঘাট, ১৩ নম্বর ঘাট, ১২ নম্বর টেইগ্যার ঘাট, ১১ নম্বর মাতব্বর ঘাট, বাংলাবাজার ঘাট, অভয় মিত্র ঘাট, সদরঘাট ও ফিশারিঘাট অন্যতম। কর্ণফুলীতে তেল চোরচক্রে রয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসনের কতিপয় কর্মকর্তাসহ কমপক্ষে অর্ধশত ব্যক্তি।
এ বিষয়ে চট্টগ্রামের সদরঘাট নৌ থানার ওসি মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, আমি এখানে যোগদান করেছি ৫-৬ মাস হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তেল চোরচক্রের বিরুদ্ধে ২-৩টি মামলা হয়েছে।
Reporter Name 





















